রাহিত পারভেজ জয়, সিলেটঃ পাকিস্তানের মাটিতে টেস্টে জয় ছিল একসময় কল্পনার মতো। কিন্তু রাওয়ালপিন্ডিতে প্রথম টেস্টে জয় পেয়ে সেই অতৃপ্তি ঘুচিয়েছে বাংলাদেশ। একই মাঠে দ্বিতীয় টেস্টেও জয় তুলে নিয়ে সিরিজটাও জিতে নিয়েছে নাজমুল হোসেনের দল। এই সাফল্য বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের জন্য এক নতুন যুগের সূচনা। কারণ, এই জয় শুধু পাকিস্তানকে হারানোর জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অগ্রগতির প্রতীক।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক টেস্ট সিরিজে বোলিং পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং উজ্জ্বল। এই সিরিজে বাংলাদেশের বোলাররা বিশেষ করে পেসাররা যেভাবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন, তা অনেক প্রশংসার দাবিদার। পাকিস্তানের বিপক্ষে এই সিরিজে বোলারদের অসাধারণ পারফরম্যান্সই দলকে জয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
বাংলাদেশের পেসাররা রাওয়ালপিন্ডির মতো পিচে দুর্দান্ত বোলিং করেছেন, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে স্পিনারদের জন্য বেশি সহায়তা থাকে না। নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ এবং হাসান মাহমুদ ধারাবাহিকভাবে সঠিক জায়গায় বল করে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের চাপে রেখেছেন। বিশেষ করে রানা’র গতি এবং সুইং পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের জন্য ভীষণ কঠিন হয়ে উঠেছিল। হাসান মাহমুদও তার বাউন্স এবং মুভমেন্ট দিয়ে পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের সমস্যায় ফেলেন। সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোতে তিনি উইকেট তুলে নিয়ে বাংলাদেশের জন্য ম্যাচের গতি পরিবর্তন করেছেন। আর তাসকিন আহমেদ এই ম্যাচে তার লাইন ও লেংথের ওপর ভর করে ধারাবাহিকভাবে বল করেছেন, যা দলের জন্য খুবই উপকারী প্রমাণিত হয়েছে।
মোটকথা, বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ ছিল ধারাবাহিক, আক্রমণাত্মক, এবং পরিকল্পনা মাফিক। এই সিরিজে তাদের পারফরম্যান্সই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের বোলিং ইউনিট এখন যে কোনো কন্ডিশনে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। সামনে ভারত সিরিজে এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে, বাংলাদেশ ভালো কিছু আশা করতে পারে।
এতে টেস্ট সিরিজ জয়ের জন্য ছয় বছরের অপেক্ষার অবসান হলো। বাংলাদেশ সর্বশেষ টেস্ট সিরিজ জিতেছিল ২০১৮ সালে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। সেই সিরিজেও ক্যারিবীয়দের ধবলধোলাই করেছিল বাংলাদেশ। এরপর ছয় বছরে খেলা ১০টি টেস্ট সিরিজে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুটি ড্র করা ছাড়া আর কোনো সাফল্য নেই। এবার পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
২০১৯ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যখন টেস্ট ম্যাচ ফি বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করেছিল, তখন অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল—টেস্টে বাংলাদেশ দলের এমন ভরাডুবির পর এই সিদ্ধান্ত কতটা যৌক্তিক? কিন্তু এখন বোঝা যাচ্ছে, সেই সিদ্ধান্তই ছিল বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের পুনর্জাগরণের সূচনা। টেস্ট ফি বাড়ানোর পর থেকেই বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের টেস্টে আগ্রহ বেড়েছে, যা মাঠে তাদের পারফরম্যান্সেও প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে পাওয়া দুই জয় নিয়ে একদিকে যেমন উচ্ছ্বাস আছে, অন্যদিকে আছে সতর্কতা। বাংলাদেশের দল যখন ডোমিনেট করে খেলেছে, তখন সাফল্য এসেছে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, আমরা অনেক সময় জেতা ম্যাচ হারিয়েছি, যা অর্জিত সাফল্যের মান নষ্ট করেছে। এ জন্য ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং প্রতিটি ম্যাচে ডোমিনেট করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সামনের ভারত সিরিজে এ চ্যালেঞ্জ আরো কঠিন হবে, কারণ ভারতের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জয় পাওয়ার জন্য শুধু ভালো খেলা নয়, ধারাবাহিক ভালো খেলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের প্রধান কোচ চন্ডিকা হাতুরেসিংহের অধীনে দলটি আপাতত নিরাপদে মনে হলেও, বড় টুর্নামেন্টের আগে কোচিং স্টাফে কোনো ধরনের পরিবর্তন না আনাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গত কিছু টুর্নামেন্টের ফলাফলই প্রমাণ করেছে যে, বড় টুর্নামেন্টের আগে বড় পরিবর্তন দলকে ক্ষতির মুখে ফেলে দিতে পারে।
সবশেষে, বাংলাদেশ দলের কাছে আমার একটাই আশা—তারা যেন বর্তমান ফর্ম এবং মনোভাব ধরে রেখে খেলে। বিপক্ষ দলকে ডোমিনেট করে খেলার যে মানসিকতা তারা দেখিয়েছে, সেটি যেন অব্যাহত থাকে। সামনে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ একটি বড় চ্যালেঞ্জ, তবে ইনশাআল্লাহ্, আমরা অন্তত একটি ম্যাচ জিততে পারব। এটি শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো টেস্ট ক্রিকেট বিশ্বের জন্যই একটি বড় বার্তা হবে।
শেষ কথা: ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে এবং সামনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জে টিকে থাকার জন্য শক্তভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। বাংলাদেশ এখন আর টেস্টে নতুন দল নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট দল হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছে।

Comments
Post a Comment